মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। এ পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেন, তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস খাতের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি তেলবাহী ট্যাংকার এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে।
বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে।
সাম্প্রতিক হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক তেলবাহী জাহাজ এই পথে চলাচল কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিকল্প পথে তেল সরবরাহের চেষ্টা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব বিকল্প উপায়ে তেল রপ্তানির চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে দেশটি পূর্ব–পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠানোর পরিকল্পনা জোরদার করেছে।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন সম্ভব। এর একটি অংশ সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের শোধনাগারে ব্যবহার করা হবে, আর বাকি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হবে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে সংরক্ষিত তেলের মজুত থেকেও সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মজুত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১৯ ডলারে পৌঁছে যায়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
তবে পরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংঘাত দ্রুত শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর তেলের দাম কমে প্রায় ৮৫ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।
তেলের দাম কমার এই খবরের প্রভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়।
জরুরি তেলের মজুত ব্যবহারের প্রস্তুতি
বিশ্বে তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে জরুরি মজুত ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নিয়ম অনুযায়ী তাদের সদস্য দেশগুলোকে অন্তত ৯০ দিনের তেলের মজুত ধরে রাখতে হয়।
আইইএর সদস্য দেশগুলোর সরকারি মজুতে বর্তমানে ১২০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রয়েছে। এছাড়া শিল্প খাতেও আরও প্রায় ৬০ কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষিত আছে।
বিশ্বের বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনের কাছেও বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম বাড়তে পারে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।
এই কারণে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জহির রায়হান