ঢাকা | |

বাইদু নেভিগেশন সিস্টেম: জিপিএসের বিকল্প প্রযুক্তি কি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াচ্ছে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 13, 2026 ইং
বাইদু নেভিগেশন সিস্টেমের মডেল ক্যাপশন: বাইদু নেভিগেশন সিস্টেমের মডেল
ad728

চীনের তৈরি স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থা বাইদু (BeiDou) বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পজিশনিং প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি মার্কিন জিপিএসের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে ইরানের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে।

২০২০ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন

চীন ২০২০ সালের জুলাইয়ে বাইদু নেভিগেশন সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ চালু করে। বেইজিংয়ের গ্রেট হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই বৈশ্বিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য পূরণের দিকে বড় পদক্ষেপ নেয় বেইজিং।

তাইওয়ান সংকট থেকেই শুরু

চীনের নিজস্ব নেভিগেশন প্রযুক্তি তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর। তখন বেইজিংয়ের আশঙ্কা ছিল, সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র জিপিএস ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে পারে।

এই আশঙ্কা থেকেই বিকল্প একটি স্বাধীন স্যাটেলাইট নেভিগেশন অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করে চীন।

অন্যান্য সিস্টেমের তুলনায় বেশি স্যাটেলাইট

বাইদু সিস্টেমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বড় স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী—

  • মার্কিন জিপিএস ব্যবস্থায় প্রায় ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে

  • চীনের বাইদু নেটওয়ার্কে প্রায় ৪৫টি স্যাটেলাইট কাজ করছে

  • রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও সিস্টেমেও প্রায় ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে

এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নির্ধারণের জন্য সংকেত পাঠায়।

কীভাবে কাজ করে বাইদু

বাইদু মূলত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত—

  1. স্পেস সেগমেন্ট: মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক

  2. গ্রাউন্ড সেগমেন্ট: নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ ও সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা স্টেশন

  3. ইউজার সেগমেন্ট: মোবাইল, যানবাহন বা অন্যান্য ডিভাইসে থাকা রিসিভার

স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সময়সংক্রান্ত সংকেত বিশ্লেষণ করে রিসিভার ব্যবহারকারীর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত সিগন্যালের নির্ভুলতা সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত। তবে সামরিক বা অনুমোদিত ব্যবস্থায় এই নির্ভুলতা আরও বেশি।

ইরান কি বাইদু ব্যবহার করছে?

ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দেশটি ধীরে ধীরে মার্কিন জিপিএসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাইদু প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, তারা বিভিন্ন উৎসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং কোনো একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর নির্ভুলতা বৃদ্ধির পেছনে উন্নত নেভিগেশন প্রযুক্তির ভূমিকা থাকতে পারে।

চীন-ইরান প্রযুক্তি সহযোগিতা

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোতে বাইদু-২ ব্যবহারের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র গাইডেন্স সিস্টেমকে আরও উন্নত করা।

পরে ২০২১ সালে চীন ও ইরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর এই সহযোগিতা আরও গতি পায়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এরপর থেকেই ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থায় বাইদু প্রযুক্তি যুক্ত হতে শুরু করে।

আধুনিক যুদ্ধে নেভিগেশন প্রযুক্তির ভূমিকা

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত স্যাটেলাইট নেভিগেশন প্রযুক্তি আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিচ্ছে।

আগে অত্যন্ত নির্ভুল অস্ত্র প্রযুক্তি কেবল সীমিত কয়েকটি সামরিক শক্তির হাতেই ছিল। কিন্তু এখন উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থার কারণে অনেক দেশ দূরপাল্লার অস্ত্রকে আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পারছে।

চীনের জন্যও ‘বাস্তব পরীক্ষা’

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চীনের জন্যও তাদের নেভিগেশন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের একটি বাস্তব ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বৃহৎ সামরিক অভিযানে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর—তা মূল্যায়নের সুযোগ পাচ্ছে বেইজিং।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় বলে মনে করা হয়। এসব ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক শ কিলোমিটার থেকে শুরু করে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বিশাল ভূখণ্ডে মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছড়িয়ে রাখা হয়, যা শনাক্ত করা কঠিন।

এদিকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ব্যবহারের কারণে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

কমেন্ট বক্স

নিউজলেটার

নিউজ আপডেট পিতে সাবস্ক্রাব করুন।